ঢাকা , রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬ , ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাগজে মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকার নয়ছয়? গণপূর্তে প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

লিটন আলী
আপলোড সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ০২:৫২:২২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ০২:৫২:২২ অপরাহ্ন
কাগজে  মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকার নয়ছয়? গণপূর্তে প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ



ঢাকার মতিঝিল, মিরপুর, মহাখালী বা আজিমপুরে গত কয়েকবছরে গড়ে উঠেছে সরকারি আবাসিক এলাকা। এসব আবাসিকে মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকেন। নতুন এই আবাসন প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগের বয়সই এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে। বলতে গেলে অনেক ভবনের রঙের গন্ধ এখনো নাকে লাগে। অথচ এই ভবনগুলো মেরামত করার জন্যই প্রতি অর্থবছরে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। অর্থবছর শেষ হওয়ার অজুহাতে কাগুজে ভাউচার করে টাকা ব্যয় দেখানো হয়। অভিযোগ আছে, মেরামতের নামে বরাদ্দকৃত এই টাকা যাচ্ছে গণপূর্তের কিছু অসাধু প্রকৌশলীর পকেটে।

বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারি আবাসিক প্রকল্পগুলোয় মেরামতের জন্য কেমন টাকা বরাদ্দ করা হয়, তার কিছু নথি এসেছে ডেইলী ভয়েস নিউজ  এই প্রতিবেদকের কাছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মতিঝিল গণপূর্ত বিভাগ এই এলাকায় সরকারি, আবাসিক এবং অনাবাসিক ভবনের বিভিন্ন কিছু মেরামতের জন্য মোট ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে মতিঝিলে মেরামতের জন্য তালিকা করা হয়েছে মোট ২৩২টি ভবনের। এর মধ্যে ২১৯টি আবাসিক ভবন, ১৩টি অনাবাসিক। আবাসিক ভবনের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১৭ কোটি ২ লাখ টাকা আর অনাবাসিক ১৩টি ভবনের জন্য বরাদ্দ ৪৮ লাখ টাকা।



মতিঝিলে মেরামতের জন্য যে কাজগুলো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আছে বিভিন্ন ভবনের ফ্ল্যাটের স্যানিটারি মেরামত বা নবায়ন, কোনোটির আবার দরজা-জানালা প্রতিস্থাপন। বদলিজনিত কারণে কোনো কোনো ফ্ল্যাট খালি হওয়ায় সেখানে হাইজেনিক ওয়াশের কাজ করা হবে, কোনো ফ্ল্যাটের কাজের জায়গায় আবার লেখা আছে জরুরি প্রয়োজনে রং করা এবং আনুষঙ্গিক মেরামত। কোথাও দেখানো হয়েছে টাইলসের কাজ বা কক্ষের দেয়াল অথবা সিলিংয়ের প্লাস্টারের কাজ। একেকটি কলোনির কাজের জন্য ৩ বা ৪ থেকে ৮-১০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে।

এখানে নির্দিষ্ট করে কিছু আবাসিক এলাকার কাজের নাম ও বরাদ্দ উল্লেখ করলে বিষয়টি বুঝতে আরও সহজ হবে। মতিঝিল এলাকার মতিঝিল সরকারি কলোনির (আইডিয়াল জোন) শাখা-১ এর একটি কাজের বিবরণ এ রকম–ভবন নং বি/১৬-জি, বি-১৭/জি, বি-২৮/জি, বি-১৯/জি, বি-৭২/জি ও বি-৭৩/জি এর বিভিন্ন ফ্ল্যাটের কাঠের দরজা-জানালা মেরামত ও নবায়ন এবং পিভিসি ডোর স্থাপন কাজ। এর জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। বিআইএমএইচ ডাটাবেজে এই স্থাপনার আইডি পিডব্লুডি-০১৩১০০১০৫০-৫৩। মন্তব্যের ঘরে লেখা আছে প্রণীত ভবন ভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণ হিস্ট্রি বুক এর আলোকে মেরামত কার্য প্রস্তাব করা হলো।

এই অঞ্চলেরই একটি অনাবাসিকের কাজের বিবরণ এরকম–উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৭, সেগুনবাগিচা, ঢাকার জেনারেল শাখা, উপসহকারী প্রকৌশলীদের অফিস রুম, টয়লেট ও স্যানিটারি মেরামতসহ আনুষঙ্গিক মেরামত কাজ। এর জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ৬ লাখ ৬৫ হাজার। ২ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে আরেকটি কাজের বিবরণ কিছুটা হাস্যকরই–দৈনন্দিন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ।


প্রায় সব আবাসিক বা অনাবাসিক ভবনের কাজের ধরন একই রকম। প্রতিটি ভবনের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয়ও কাছাকাছি। কাজের বিবরণেও তেমন কোনো পার্থক্য নেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মিরপুরের আবাসিক ভবনগুলোর মেরামত করার জন্য ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অঞ্চলে মেরামতযোগ্য আবাসিক ভবনের সংখ্যা ধরা হয়েছে ১৩১টি। এই ভবনগুলোয় মোট কাজের তালিকা করা হয়েছে ১৯৪টি। মিরপুরে ২৭টি অনাবাসিক ভবনের ৪৪টি কাজের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ৬০ লাখ টাকা।

মহাখালী গণপূর্ত বিভাগের আওতায় থাকা সরকারি আবাসিক ও অনাবাসিক ভবনগুলো মেরামতের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের অধীনে থাকা ভবনগুলোর জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

এ ছাড়া শেরেবাংলা নগর-১ গণপূর্ত বিভাগে ২০ কোটি ৫০ লাখ, রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে ২৯ কোটি, ইডেনে (সচিবালয়) ২৫ কোটি, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ ৬ কোটি ৭০ লাখ, গাজীপুরে ৩ কোটি ৯ কোটি, আরবারি কালচারে ১১ কোটি ৫০ লাখ, নগর গণপূর্ত বিভাগে ২৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

যেকোনো আবাসিক বা অনাবাসিক ভবনে প্রয়োজন হলে মেরামত বা সংস্কার করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নতুন নতুন সরকারি এই আবাসন প্রকল্পগুলোতে মেরামত বা সংস্কার আসলে কতটা জরুরি। এ ছাড়া এক, দুই বা তিন বছর পুরোনো একটি ভবনে যদি সিলিংয়ের পলেস্তারা খসে পড়ার মতো ঘটনা ঘটে, তখন এই প্রশ্নও ওঠে–সেই ভবন নির্মাণে কতটা ঠিকভাবে কাজ করা হয়েছে!

অন্যদিকে অভিযোগ আছে, গণপূর্তের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে ভুয়া বিল ও ভাউচার বানিয়ে মেরামতের জন্য বরাদ্দ অর্থের বড় একটা অংশ লোপাট করে ফেলে। এভাবেই প্রতি অর্থবছরে সরকারি কোষাগার থেকে নষ্ট হচ্ছে শত শত কোটি টাকা।


অভিযোগের বিষয়ে জানতে থেকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয় মহাখালী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাজিবুল ইসলাম, 
আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের ফয়সাল হালিম ও মিরপুর গণপূর্ত বিভাগের হাসিনুর রহমানের সঙ্গে।  তিনি বলেছেন, ‘বরাদ্দ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এই বরাদ্দগুলো তো আমি দিই না, হেড অফিস থেকে দেওয়া হয়।’

অন্যদিকে পুরো গণপূর্ত অধিদপ্তরই যেন আক্রান্ত হয়েছে লটারি জ্বরে। পদায়নের লটারি শুরু হওয়ার গুঞ্জনের পর থেকেই অফিস বিমুখ হয়ে পড়েছেন প্রকৌশলীরা। যারা অফিস করছেন, তাদের মধ্যেও কেমন একটা উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কাজে মন বসাতে পারছেন না। সেবাপ্রার্থীরা এ নিয়ে পড়েছেন নানা ভোগান্তিতে। অফিসগুলোতে ধরনা দিয়েও কাজ হচ্ছে না।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ